রিসাইক্লিং ও সার্কুলার ইকোনমি: কম বর্জ্যে বেশি লাভের সহজ পথ

একটা প্লাস্টিক বোতল, পুরোনো কাগজ, বা ছেঁড়া জামা, এগুলো আপনি কোথায় ফেলেন? বেশিরভাগ সময় এগুলো "আবর্জনা" হয়ে যায়। কিন্তু ঠিকভাবে ভাবলে এগুলো সম্পদও হতে পারে।

রিসাইক্লিং মানে হলো ব্যবহার শেষে জিনিসকে প্রক্রিয়াজাত করে আবার কাঁচামাল বানানো। আর সার্কুলার ইকোনমি মানে হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে জিনিস যতদিন সম্ভব ব্যবহার, মেরামত, পুনর্ব্যবহার, আর শেষে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে বারবার কাজে লাগে। এই লেখায় আপনি শিখবেন, দুটো কীভাবে কাজ করে, কেন এটা টাকাও বাঁচায়, আর কীভাবে আজ থেকেই শুরু করা যায়।

রিসাইক্লিং আর সার্কুলার ইকোনমি, একই কথা নয়, পার্থক্যটা বুঝলেই সব সহজ

অনেকে ভাবেন, রিসাইক্লিং করলেই সার্কুলার ইকোনমি হয়ে গেল। আসলে রিসাইক্লিং হলো বড় ছবির একটা অংশ। সার্কুলার ইকোনমি হলো পুরো ছবিটাই। একটাকে ভাবুন শেষ ধাপের "উদ্ধার কাজ" হিসেবে, আরেকটাকে ভাবুন শুরু থেকেই "স্মার্ট পরিকল্পনা" হিসেবে।

রিসাইক্লিংয়ের লক্ষ্য সাধারণত বর্জ্য কমানো। প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু, কাচ, এগুলো আলাদা করে সংগ্রহ হলে রিসাইক্লিং সম্ভব হয়। এতে নতুন কাঁচামালের চাপ কমে। তবে বাস্তব সমস্যা আছে। সব প্লাস্টিক রিসাইকেল হয় না। অনেক প্যাকেট বহু-স্তরের হয়, ভাঙা কঠিন। আবার নোংরা থাকলে পুরো ব্যাচ নষ্টও হতে পারে। তাই শুধু রিসাইক্লিংয়ের উপর ভরসা করলে কাজ অর্ধেকই থাকে।

সার্কুলার ইকোনমি একটু ভিন্নভাবে প্রশ্ন করে, "জিনিসটা ফেলতেই হবে কেন?" এখানে মূল কথা হলো পণ্যের জীবন বাড়ানো। একই ফোন ৪ বছর চালানো, বোতল রিফিল করা, জামা সেলাই করে আবার পরা, এগুলো সার্কুলার ভাবনার উদাহরণ। এতে খরচ কমে, বর্জ্য কমে, আর স্থানীয় কাজের সুযোগও বাড়ে (মেরামত, রিফিল, সংগ্রহ, বাছাই)।

মনে রাখুন, রিসাইক্লিং অনেক সময় শেষ ভরসা। সার্কুলার ইকোনমি হলো শুরু থেকেই কম বর্জ্য তৈরি করার অভ্যাস।

লিনিয়ার মডেল বনাম সার্কুলার মডেল, কোথায় অপচয় হয়, কোথায় সাশ্রয় হয়

লিনিয়ার মডেল খুব পরিচিত, নেওয়া, বানানো, ব্যবহার, ফেলা। এটা যেন একমুখী রাস্তা। ফলে প্রতিবার নতুন কাঁচামাল লাগে, শক্তি লাগে, আর শেষ স্টপে পাহাড়সম বর্জ্য জমে।

সার্কুলার মডেল হলো ঘুরে দাঁড়ানো রাস্তা। নেওয়া, বানানো, ব্যবহার, মেরামত, ফেরত, আবার ব্যবহার, শেষে রিসাইকেল। ধরুন ফোনের কথা। স্ক্রিন বদলালে ফোন আরও বছরখানেক চলে। জামার বোতাম লাগালে সেটা আবার নতুনের মতো লাগে। একইভাবে কাচের বোতল ধুয়ে রিফিল হলে একবারের প্লাস্টিক বোতল কম লাগে। তাই সাশ্রয়টা শুধু পরিবেশে নয়, আপনার পকেটেও।

রিসাইক্লিং এই চক্রের এক অংশ, কমানো আর পুনর্ব্যবহার কেন আগে আসে

৩আর (Reduce, Reuse, Recycle) আসলে একটা অর্ডার। প্রথমে Reduce, কম কেনা, কম প্যাকেট, কম অপচয়। এরপর Reuse, একই জিনিস বারবার ব্যবহার। সবশেষে Recycle, কারণ এটা করতে শিল্পকারখানা, পরিবহন, শক্তি, সবই লাগে।

আরও একটা সত্যি কথা আছে, সব জিনিস রিসাইকেল হয় না। কিছু জিনিস রিসাইকেল হলেও মান কমে যায়। তাই "রিসাইকেল করলেই সব ঠিক" ভাবনাটা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং আগে কমান, তারপর পুনর্ব্যবহার করুন, তারপর যা বাকি থাকে সেটাকে রিসাইকেল করুন। এই ধারাবাহিকতাই কাজ সহজ করে।

কোন জিনিস কীভাবে রিসাইকেল হয়, আর কোন ভুলে পুরো সিস্টেম ভেঙে যায়

রিসাইক্লিংয়ের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করে আপনার ঘরের অভ্যাসের উপর। শহর বা এলাকার নিয়ম আলাদা হতে পারে, তাই স্থানীয় নির্দেশনা মিলিয়ে নিন। তবু কয়েকটা নিয়ম প্রায় সবার জন্যই কাজে লাগে।

রিসাইক্লিং সাধারণত দুই ধাপে এগোয়। প্রথমে আলাদা করে সংগ্রহ, তারপর বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত। আপনি যদি শুরুতেই ঠিকভাবে আলাদা করেন, পরের ধাপগুলো অনেক সহজ হয়। উল্টোটা হলে খরচ বাড়ে, আর অনেক কিছু শেষ পর্যন্ত ডাম্পিং গ্রাউন্ডেই যায়।

কাগজ সাধারণত পাল্প বানিয়ে আবার কাগজ হয়, তবে ভিজে গেলে মান পড়ে। ধাতু (অ্যালুমিনিয়াম, টিন) গলিয়ে নতুন পণ্য হয়, তাই এটা বেশ মূল্যবান। কাচ গলিয়ে আবার কাচ হতে পারে, কিন্তু ভাঙা কাচ নিরাপদভাবে দিতে হয়। প্লাস্টিক সবচেয়ে ঝামেলার, কারণ ধরন অনেক, আর সবখানেই সব ধরন নেওয়া হয় না।

ঘরে বসেই সঠিকভাবে আলাদা করুন, ভেজা আর শুকনা আলাদা হলেই অর্ধেক কাজ শেষ

সবচেয়ে সহজ নিয়ম, ভেজা আর শুকনা আলাদা। এই একটা অভ্যাসই গন্ধ কমায়, পোকা কমায়, আর রিসাইক্লিংয়ের সুযোগ বাড়ায়।

ভেবে দেখুন এভাবে:

  • ভেজা বর্জ্য: রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, ফলের খোসা, চা-পাতা, ডিমের খোসা। এগুলো কম্পোস্ট করা যায়।
  • শুকনা বর্জ্য: কাগজ, কার্ডবোর্ড, প্লাস্টিক বোতল, ধাতুর ক্যান, কাচের বোতল। এগুলো রিসাইক্লিংয়ের মূল অংশ।
  • বিপজ্জনক বর্জ্য: ব্যাটারি, বাল্ব, ওষুধ, সিরিঞ্জ, ই-বর্জ্য। এগুলো আলাদা রাখতে হয়, কারণ এগুলো মিশলে ঝুঁকি বাড়ে।

একটা ছোট টিপ কাজের, শুকনা জিনিস শুকনাই রাখুন। ভেজা হলে কাগজ নরম হয়, গন্ধ ধরে, আর বাছাই কঠিন হয়।

কনটামিনেশন মানে কী, তেল মাখা কাগজ, নোংরা প্লাস্টিক, মিশ্র প্যাকেট কেন ঝামেলা

কনটামিনেশন মানে হলো রিসাইক্লিংয়ের জিনিসে খাবার, তেল, ময়লা, বা ভুল বর্জ্য মিশে যাওয়া। তখন পুরো বস্তা বা বড় অংশই অযোগ্য হয়ে যেতে পারে। কারণ বাছাই করতে সময় লাগে, পানি লাগে, আর শ্রম খরচ বাড়ে।

দৈনন্দিন কয়েকটা উদাহরণ খুব পরিচিত। পিৎজা বক্সের তেল লাগা অংশ রিসাইকেল করা কঠিন, যদিও পরিষ্কার অংশটা অনেক সময় চলে। চিপস বা বিস্কুটের বহু-স্তরের প্যাকেট আলাদা করা কঠিন, তাই অনেক জায়গায় এটা নেওয়া হয় না। টিস্যু বা ন্যাপকিন সাধারণত জীবাণু আর ভেজাভাবের কারণে রিসাইক্লিংয়ের উপযুক্ত নয়।

দ্রুত তিনটা করণীয় মনে রাখুন:

  1. ধুয়ে শুকিয়ে দিন: বোতল বা ক্যান হালকা করে কুলি করলেই অনেকটা কাজ হয়ে যায়।
  2. ক্যাপ আলাদা করুন: স্থানীয় নিয়মে যদি বলা থাকে, ক্যাপ খুলে আলাদা দিন।
  3. সন্দেহ হলে আলাদা রাখুন: একসাথে মিশিয়ে "সব নষ্ট" করার চেয়ে আলাদা ব্যাগে রাখা ভালো।

সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবে কেমন, পরিবার, ব্যবসা, আর শহর মিলে কীভাবে বদল আনা যায়

সার্কুলার ইকোনমি শুনতে বড় কথা মনে হতে পারে। কিন্তু এটা শুরু হয় খুব ছোট কাজ থেকে। পরিবার কম বর্জ্য তৈরি করলে সংগ্রহ সহজ হয়। ব্যবসা পণ্য ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করলে রিসাইক্লারদের কাজ সহজ হয়। আর শহর নিয়ম করে দিলে সবাই এক ছন্দে চলতে পারে।

এর লাভ কল্পনার নয়। কম কেনাকাটা মানে সরাসরি টাকা বাঁচা। মেরামত আর রিফিল মানে স্থানীয় দোকান, কারিগর, আর ছোট ব্যবসার আয় বাড়া। বর্জ্য কমলে নালা আটকানো কমে, দুর্গন্ধ কমে, আর পোড়ানোর চাপও কমে। বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ, দুই জায়গাতেই এই সুবিধাগুলো একইভাবে প্রাসঙ্গিক।

পণ্য কেনার সময়ই সিদ্ধান্ত নিন, টেকসই, রিফিল, মেরামত, আর সেকেন্ড-হ্যান্ড কেন স্মার্ট

সার্কুলার অভ্যাস অনেকটাই কেনার সময় তৈরি হয়। কেননা একবার ঘরে ঢুকলে সেটা শেষ পর্যন্ত বর্জ্য হবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। তাই কেনার আগে একটু থামুন।

পাঁচটা ছোট আইডিয়া মনে রাখুন:

  • রিফিল প্যাক বা রিফিল স্টেশন বেছে নিন, যেখানে সম্ভব।
  • কাচ বা ধাতুর বোতল ব্যবহার করুন, কারণ এগুলো বহুবার চলে।
  • রিপেয়ার শপে ছোটখাটো সমস্যা ঠিক করুন, নতুনটা কিনতে তাড়া নেই।
  • ভাড়া বা শেয়ার করুন, যেমন মাঝে মাঝে লাগে এমন যন্ত্র।
  • সেকেন্ড-হ্যান্ড পোশাক বা আসবাব চেষ্টা করুন, অনেক সময় মান ভালোই থাকে।

সবচেয়ে শক্তিশালী পদক্ষেপটা কিন্তু সহজ, কম কেনা। কম জিনিস কিনলে কম বাছাই করতে হবে, কম ফেলতে হবে।

ব্যবসা আর স্থানীয় উদ্যোগ, ডিপোজিট-রিটার্ন, টেক-ব্যাক, কম্পোস্টিং, আর রিসাইক্লারদের ন্যায্যতা

ব্যবসা চাইলে সার্কুলার ব্যবস্থা অনেক দ্রুত এগোয়। ডিপোজিট-রিটার্ন মানে বোতল ফেরত দিলে কিছু টাকা ফেরত পাওয়া। এতে মানুষ ফেরত দেয়, আর বোতলও পরিষ্কারভাবে সংগ্রহ হয়। টেক-ব্যাক প্রোগ্রামে ব্র্যান্ড পুরোনো পণ্য ফেরত নেয়, যেমন ই-বর্জ্য বা প্যাকেজিং। এতে ভুল জায়গায় ফেলা কমে।

পাড়ায় কম্পোস্টিংও দারুণ কাজ করে। ভেজা বর্জ্য আলাদা হলে সার, মাটি, গাছ, সবই লাভবান হয়। পাশাপাশি একটা মানবিক দিক ভুললে চলবে না। অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহক আর রিসাইক্লাররা অনেক শহরে সিস্টেমের বড় ভরসা। তাদের গ্লাভস, মাস্ক, নিরাপদ বাছাইয়ের জায়গা, আর ন্যায্য দাম নিশ্চিত হলে পুরো চক্রটাই শক্ত হয়।

সার্কুলার ইকোনমি মানে শুধু "সবুজ" হওয়া নয়, এটা ভালো ব্যবস্থা আর ন্যায্য আচরণও।

উপসংহার

একটা বোতল বা কাগজকে আপনি আজই নতুন জীবন দিতে পারেন, শুধু অভ্যাসটা বদলালেই হয়। শুরু করুন এই তিনটা এক লাইনের পদক্ষেপে: (১) ভেজা-শুকনা আলাদা করুন, (২) কম কিনুন, পুনর্ব্যবহার আর মেরামতকে অগ্রাধিকার দিন, (৩) স্থানীয় নিয়ম মেনে যা সম্ভব রিসাইকেল করুন। আগামী এক সপ্তাহ নিজের জন্য একটা ছোট চ্যালেঞ্জ নিন, প্রতিদিন একবার করে "ফেলার আগে ভাবুন", দেখবেন সার্কুলার চিন্তা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

Post a Comment

0 Comments